ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ আবারও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। গত রোববার (১৭ মে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছিলেন।
তবে এর পরদিনই তিনি জানান যে, ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ সচল থাকায় পরিকল্পিত নতুন হামলাটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
তা সত্ত্বেও ইরানি পক্ষ সম্ভাব্য নতুন হামলা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। তারা ইঙ্গিত দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা চালানো হলে প্রতিবেশী দেশগুলো এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে বাধ্য করা হবে।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স-এর ইরান বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক হামিদ রেজা আজিজি জানান, চলতি বছরের প্রথম দফার যুদ্ধে ইরানিরা প্রায় তিন মাসের একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রস্তুতি নিয়েছিল।
আজিজির মতে, ইসরাইল ও আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে সে সময় ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার কিছুটা সীমিত রেখেছিল।
তবে এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এবার যদি নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইরানি নেতৃত্ব ধারণা করছে যে এই লড়াই হবে ‘স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত তীব্র’। বিশেষ করে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে শত্রুপক্ষ সমন্বিত ও ব্যাপক হামলা চালাতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছে। ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ বিশেষজ্ঞ এবং সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য বক্তব্য পর্যবেক্ষণ করেই আজিজি এই আভাস দিয়েছেন।
হামিদ রেজা আজিজি বলেন, নতুন লড়াইয়ে শত্রুকে কার্যকরভাবে কাবু করতে এবং প্রতিপক্ষের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে ইরান প্রতিদিন কয়েক ডজন থেকে কয়েক শ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর তীব্র হামলার মুখোমুখি হতে হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্র, শোধনাগার ও বন্দরগুলোতে আঘাত হেনে বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই হবে ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশল। যদি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হয়, তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো এই যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে—যা উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা যেকোনো মূল্যে এড়াতে চান।
সংযুক্ত আরব আমিরাত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে ইরানের ওপর হামলায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে—এমন ধারণা থেকে গত কয়েক সপ্তাহে ইরানি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা তীব্র আমিরাত বিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি কিছু সংবাদ প্রতিবেদনেও দাবি করা হয়েছে, মার্কিন-ইসরাইলি হামলার সময় আমিরাত ও সৌদি আরব গোপনে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল।
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক মেহেদি খারাতিয়ান গত মাসে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, “আমাদের অবশ্যই আমিরাতকে উটে চড়ার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং আমরা তা করতে পারি। প্রয়োজন হলে আমরা আবুধাবি দখল করব।”
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আলী আলফোনেহ এক ই-মেইলে মন্তব্য করেছেন, এই বক্তব্যগুলো অতিরঞ্জিত মনে হলেও তা ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরের ‘গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাধারাকে প্রতিফলিত করে’।
একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ (নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক্ট)-এর খবরগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আলফোনেহ। তিনি জানান, তেল উৎপাদনকারী প্রধান দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলার এই প্রচ্ছন্ন হুমকিই এখনো তেহরানের প্রতি ওয়াশিংটনের আচরণকে সংযত রাখার অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
হামলার জবাবে ইরান বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতে পারে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ পরিবাহিত হয়। এই রুটটি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ঠিক পাশেই অবস্থিত।
গত দফার লড়াইয়ে ইরানিরা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। হামিদ রেজা আজিজি মনে করেন, ইরান যদি বুঝতে পারে যে এই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হুমকির মুখে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একই সাথে দুটি সামুদ্রিক ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখার কৌশল নিতে পারে।
মেহেদি খারাতিয়ানও তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে চায়, তবে ইরান বাব আল-মান্দেবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করে এর পাল্টা জবাব দেবে।
এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে সক্ষম হলেও কৌশলগতভাবে এটি শেষ পর্যন্ত বেশ জটিল রূপ নিতে পারে। এদিকে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলে হুতি মিলিশিয়ারা ইরানকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও গত দফার লড়াইয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ সতর্ক। বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা মূলত তাদের ফুরিয়ে আসতে থাকা সামরিক মজুত থেকে ঠিক কতটুকু ব্যবহার করার সামর্থ্য রাখে, সেই হিসাব-নিকাশ করেই পা বাড়াচ্ছে।
Leave a Reply